আমার দুহাত

আমার দুহাত আজ জাতিস্মর শ্রমণ হয়েছে
আমার হৃদয়ে নেই স্মৃতির আবেগ সেখানে কেবলি গুমরে ওঠে
অনিবার তৃষ্ণা দাহ ও যন্ত্রণা
কেননা হৃদয়কে তো আমি আর কোনোভাবেই দেখতে পাই না-
কিন্তু আমার এই জাতিস্মর দুই হাত একদিন তোমার উচ্চকিত
      মুখ ছুয়েঁছিল
ছুয়েঁছিল তোমার চিবুক মসৃণ ত্বকের সৌরভ গ্রীবার অসম্ভব ঔদ্ধত্য
তোমার চোখের তারায় সেদিন আনন্দর অনির্বচনীয় উন্মাদনা
      প্রেমের পরাগ
বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছিল অনন্য উপহার তোমার ক্ষৌম স্পর্শের
      পরাক্রান্ত পেলবতা-
সেটা কি ঘোর বর্ষা ছিল নাকি উত্তরবসন্ত?
কিন্তু কেমন করে যেন আমাদেরকে সময়ের সমাচার না দিয়েই
গড়িয়ে গেল দিনের পর দিন এক ঋতু থেকে পরবর্তী
ঋতুর বিবর্তনে
যেন এক দীর্ঘ টানেল ধরে ছুটে চলেছি আমরা দু’জনা
সময়ের অদৃশ্য সিড়িঁ ডিঙিয়ে প্রহরের পর প্রহর ঘন্টা দিন
সপ্তাহ মাস বৎসর
সময় কি তোমাকে আজ ক্লান্ত ক্লান্ত করে?

অথচ এই তো সেদিন আমাদের প্রতিজ্ঞা ছিল
আমাদের যুগ্ম-অস্তিত্বের বন্ধন শিথিল হবে না কোনদিন
বৎসরের পর অতিক্রান্ত বৎসর প্রতিশোধ নেবে লোলচর্মে পক্ককেশে
কিন্তু তবু তোমার কণ্ঠে তো সেই দুর্মর প্রতিজ্ঞাই উচ্চারিত
      হয়েছিল সেদিন
যেন চিরন্তন বন্ধনের মধ্যেই আমাদের সীমাহীন মুক্তির নিবিড় আস্বাদ
      নিঃশেষিত না হয় কোনদিন
আজকে কি অন্য কোনো প্রাচুর্য কোনো নতুন দিগন্তে তাড়িয়ে
                  নিচ্ছে তোমাকে
      ছুটন্ত হরিণীর মত ক্ষীপ্র উদগ্রীব?
হয়তো দুর্ভাগ্য আমাদের যে কোনো প্রার্থিত পৃকৃতির কোলে
      আমাদের স্বর্ণখেলনা রচনা করতে পারিনি
                  শয্যা রচনা করতে পারিনি
      সবুজ মত্ততায় ভরা কোনো ঘাসের গালিচায়

কিন্তু আশ্বিনের পড়ন্তবেলার বিচ্ছুরিত রশ্মি যখন
শেষ বিকেলের সারাটা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে গুঁড়ো গুঁড়ো
                  সোনালী কণা
তখন আমার স্বপ্নে ও মননে এক অপার্থিব মানবীর মতো তোমাকে দেখেছি
তোমারি চকিত চোখে প্রেমের প্রশান্ত আভা আর ওপরে সীমাহীন
                  আকাশের স্বাধীনতা

সেই প্রকৃষ্ট মুহূর্ত কি সত্য ছিল না?
আমি চেয়েছিলাম তোমার মধ্যে তোমার প্রকৃত সত্তার উদ্বোধন যেন সত্য
                  হয়ে ওঠে।
যে বাস্তবতার মধ্যে আমাদের প্রথম সাক্ষাৎকার তার গ্লানি যেন
আর কোনোদিন স্পর্শ না করে তোমাকে
আমাদের প্রেম যেন বন্ধন না হয়ে এক উজ্জ্বল প্রবল মুক্তি দিয়ে তোমাকে
                  অভিসিক্ত করে
কেননা তোমার পরম সত্তার যথার্থ মুক্তির মধ্যেই আমার অস্তিত্বের
                  চূড়ান্ত স্বার্থকতা
      আমার দ্রোহ উন্মাদনা এবং সত্যের স্বতঃস্ফূর্ত প্রস্ফুটন-
কেবল তোমার রাত্রির মতো চুলের প্রপাতে নয় ভ্রমরকৃষ্ণ চোখের গভীর
      চাওয়ার নয়
নবনীত দেহের শিহরিত রোমাঞ্চে নয় তোমার সমস্ত হৃদয়
                  মনন ও মানসের
সমান্তরালে আমার সমূহ সত্তার প্রবল অঙ্গীকার দিয়েছি তোমাকে
সেই আমার শ্রেষ্ঠতম গৌরব তোমার অবয়বকে পেরিয়ে অনন্তকালের
                  দিকে প্রসারিত
সে অনেকদিন আগে বেশকিছু জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া পাথর
      কুড়িয়ে পেয়েছিলাম
আজকে কোথায় যে হারিয়ে গেছে মনে নেই আর
ওমনি হারিয়ে গেছে কত স্মৃতি কত মুখ আমার শৈশব কৈশোর
আমার মা মায়ের স্মৃতি ও সত্তা
কিন্তু সমস্ত স্মৃতি ম্লান হয়ে যায় তোমার আমার অসম্ভব সুন্দর
                        সময়ের কাছে
সেই মুহূর্তগুলো সপ্তবর্ণ বুদ্বুদের মতো ক্ষণিক অথচ চিরন্তন
কিন্তু ঐ পাথরে ছিল শতাব্দীর শতাব্দীর জীবনের প্রতিলিপি সময়ের
নিঃশব্দ সঞ্চরণ
এবং কি বিপুল ধৈর্য্যের অঙ্গীকার সেই পাথরের প্রাকৃত লিপিতে
কিন্তু পাথর তো কোনো স্পর্শের আলিঙ্গন দিতে পারে না কখনো
অথচ দেখ আমার দুহাতে পাথরের মতো প্রাচীনতা নেই
কিন্তু তবু একদিন তোমার মুখ এ দুহাত সুনিশ্চিত উষ্ণতায়
                        ধারন করেছিল
আমার অমর দুই হাত তাই তোমার স্মৃতিকে সর্বদাই লালন করতে থাকে
                        পরম গৌরবে
আমার দশটি আঙুল তোমার চুলের মধ্যে বিচরণ করতে
                        থাকে অনবরত
একেকটি চুল যেন একেকটি কবিতার চরণ প্রো্জ্জ্বল সুঠাম সুরভিত
রণিত শব্দের আনন্দে উদ্বেল মুগ্ধ দিনগুলোকে শুনেছ কি
রচনা করেছ কি কোন অনুপুঙ্খ দিনপঞ্জী?
পাঁচটি আঙুলে নাড়ি পাঁচটি বছর আঠারো শো ছাব্বিশটি দিন তোমার
      অস্তিত্বের স্পন্দন আমার হৃদপিণ্ডে গ্রথিত হয়েছে
আমার অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে গেছ তুমি এই দেখ এই বুকে
                        হাত রেখে দেখ
যেমন দেখেছিল আমার অন্ধহাত তোমার মুখ
তোমার গ্রীবা তোমার স্তনাগ্রচূড়া ওষ্ঠ জঙ্ঘা ঊরুদেশ
                        শ্রোণীতট যোনী-
কেবলি স্পর্শের প্রজ্জ্বলন নয় এ দুটো হাতের স্পর্শ
তোমার সমস্ত অবয়বে হৃদয়ে সত্তায় তারা শেষহীন প্রশ্নের
                        মতো দুর্মর
এবং বারম্বার সীমান্তবিহীন বিমর্ষতা ও নিরানন্দ পরিণত হয়েছে
            পরমানন্দে তোমারি শরীরের উত্তরে
এখনো তোমার মুখ আমার মুখে মিলিয়ে যায় মিশে থাকে
                        চৈতন্যের কেন্দ্রে
কিন্তু সেকি এখনো সম্পূর্ণভাবে নিজেকে উন্মেচন করে পরিপূর্ণ
            নিবেদন করে ওষ্ঠে জিহ্ববায় জিহ্বায়
      তোমার আবেগ আকাঙ্ক্ষা স্মৃতি ও ভবিতব্য
কোনো সন্দেহ কি উকিঁ দেয় বোধের ভেতরে আজ?

অথচ নিশ্চিত জেনো আমার এ দুটো অন্ধহাত অন্ধ প্রেমের
                        মতো যেন
            তোমার বিহনে আজ কিছুই বোঝে না আর
এবং তার একক বিশ্বাস তোমার কল্যাণের গভীরতম আকাঙ্ক্ষায়
                        প্রার্থনায়
অবিমিশ্র সীমাহীন সব রূপকল্পে নৃত্যপর প্রতিদিন প্রতিক্ষণ
            প্রতিটি মুহূর্তের অনেকান্ত আন্দোলন

আমার একমাত্র নিবিষ্ট প্রেরণা তোমার হৃদয়ের স্পর্শে তোমার
            তরঙ্গায়িত শরীরে স্পন্দিত ঢেউয়ের দোলাচলে
আমার দুহাত এক অন্ধবিশ্বাসের আবেগে উত্তাল-
আবার যখন তোমার আবিষ্ট মুখ আমার বুকের আশ্রয়ে
তোমার বাহুর স্রোত যখন আমার কম্পমান শরীরে বেষ্টিত
যখন তোমার হৃদপিণ্ডের সঞ্চালন আমার হৃদয়ের গহনে কম্পিত
তখন আমার এই অন্ধ দুহাত পুনর্বার পরিপূর্ণ হবে
এবং সমস্ত দিগন্ত কাপিয়েঁ তুলবে একটি মাত্র চিৎকারে-
                              আমি ভালোবাসি।