বৈশাখের বিবেচনা

প্রতি বছর বৈশাখ এসে ঘুরে যায় যথারীতি
পয়লা বৈশাখের বর্ণাঢ্য আচার অনুষ্ঠান হয় গতানুগতিক,
আবার কখনো সখনো পয়লার পরেও চলতে থাকে
নতুন বৎসরের নানাবিধ আবাহন যেন আমাদের বর্ণহীন জীবনের
চোয়ালে, হয়তো বা কিছুটা পশ্চিমের অনুকরণে, নানারঙের প্রলেপ
লাগাবার বাচাল চমক।
বাংলার আবহমান সংস্কৃতির জন্যে অন্তত এই একদিন
উপচে পড়ে আমাদের নিষ্প্রাণ নিষ্প্রভ আনুষ্ঠানিক ভালবাসার
পেয়ালা।
এমনি করে ১৪১১ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখও অপসৃয়মান
জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় শ্রাবণ আর ভাদ্রের টানে
প্রতি বছরই যেমনটা হয় পৃথিবীর অমোঘ আবর্তনে।
এবারও বৈশাখ এসেছে সশব্দে তবে ততটা মেঘের করতালিতে নয়
যতটা রাজপথে ঘাতকের গুলিতে প্রচণ্ড সন্ত্রাসে জনজীবন গুড়িয়েঁ
দিয়ে
নিয়ন্ত্রণহীন বর্বরতায় প্রাণ দ্যায় যতো সাধারণ মানুষ
আমরা ততোই অপার নির্বেদে জনগণের জন্যে অঢেল অশ্রু বিসর্জন
করি
এই প্রমত্ত বৈশাখে।
আমাদের এইসব নানাবিধ নির্লজ্জ হৈচৈয়ের জনান্তিকে
বৈশাখ এবারও কিন্তু অলক্ষ্যে চলে যাবে
এবং হয়তো বা কিছুটা অভিমানভরে চলে গিয়ে বেঁচে যাবে,
কিন্তু আমাদের দৃশ্যপটে সে যা ফেলে যাচ্ছে
তাতে না আছে বিগত বছরের আবর্জনা বিদায় করার উচ্ছ্বাস
না আছে নতুন বছরের প্রথম বর্ষণের আনন্দধারার করুণাময় আর্দ্র
নরোম নিবেদন।
মনে হয় যেন চারদিকের খটখটে খরায় চৌচির ফেটে যাচ্ছে মাটি।
এবার এসেছিল আমের বোল অনেক সম্ভাবনায় প্রতিটি ডাল নুইয়ে
দিয়ে
আমাদের যত্নে লালিত আকাঙ্ক্ষাগুলোর মতো,
কিন্তু বৃষ্টি নেই উষর বরেন্দ্রে
তাই হয়তো ঝরে যাবে সবই অনিবার্যভাবে।
এবারও বৈশাখে পেয় পানির অভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত
জনজীবন,
মনে হয় আপাতত কণ্ঠাগত আমাদের অর্থহীন প্রাণ এই অবিবেকী
বিপন্ন নগরে।
ভয় হয় মানুষের অসহ্য চাপে হঠাৎ থেমে যাবে সমস্ত ট্রাফিক
যেন প্রস্তরিভূত হয়ে যেতে পারে রাস্তার সমস্ত চলাচল
যেমন ভারী হয়ে চেপে থাকে বিশ্রী দূষণে হতভাগ্য এই নগরীর
অসহায় বাতাবরণ।
কেবল উঠছে চারদিকে গণ্ডায় গণ্ডায় অভ্রভেদী দরদালান
কোন উৎস থেকে আসে তার প্রবল রসদ তা কি এই বৈশাখ জানে?
এখন এই বিশ্লিষ্ট সময়ে ঐ অট্টালিকাগুলোকে মনে হয়
মৃত নগরীর একেকটি চিত্রার্পিত খণ্ডিত দৃশ্য,
এক প্রকাণ্ড শূণ্যতার ভিতের ওপর শেকড়হীন সমাজের মাথায়
নড়বড়ে ঐ দরদালান আর কতকাল এমন মর্মান্তিক দাঁড়াতে পারবে বৈশাখের ঝড়ে?
আগামী কোন এক বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখে
আমাদের কেউ কেউ হয়তো থাকবো না এমন অনুষ্ঠানে
কিন্তু কালবৈশাখী যদি এসেই পড়ে সেবার
সমস্ত আকাশজুড়ে ফুসেঁ ওঠা কুড়কুড় মেঘের বিদ্যুতে
আর ঝেঁটিয়ে নিতে চায় এই শেকড়হীন সমাজের আবর্জনারাশি-
নড়বড়ে দরদালান গলির সমস্ত নোংরা বস্তির দুঃসহ অস্তিত্বের যত
গ্লানি?
সূর্যটা যদি আজকের প্রখর উষ্মার চেয়েও সহস্রগুণ বর্ধিত উষ্ণতায়
হঠাৎ গলে গলে পড়তে থাকে বঙ্গপোসাগরে আর গনগনে হল্কায়
সমুদ্র থেকে জবা কুসুমশঙ্কাশ জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে উঠে আসে
অতিকায় ডায়নোসরের মতো লেলিহান আগুনের বিদ্যুৎবাহ জিহ্বা
এবং তার প্রচণ্ড শক্তিতে চেচে নেয় আমাদের সমতলের সমস্ত
জঞ্জাল?
তাহলে তারপরে কি উদয় হবে আবার করুণাময় সুন্দুরের?
জীবনের উন্মেষের সম্ভাবনায় সূচিস্নাত প্রতীকের মতো একটা স্নিগ্ধ
মঙ্গলময় লাল সূর্য?
আপাতত এই মুণ্ডুহীন ভয়াবহ শহরে অনড় অবস্থান নিয়েছে
সবাই
কেউ কেউ কথা বলবে না কেউ কেউ আবার কাউকে কথা বলতে
দেবে না
কেউ কেউ আবার পূর্বাপর অসংলগ্ন কথা বলবে,
আর মাঝে মাঝে বেকেঁ বসা গোঁয়ার পশুর মতো
থেমে যাবে সাধারণ মানুষের যাপিত জীবন এই দুঃস্বপ্নের মতো
অবিশ্বাস্য সন্ত্রস্ত শহরে
এবং তারপরে গতায়ূ চৈত্রের খরার মতো যে ক্ষুধা জ্বলবে সর্বত্র
তাতে পানি ঢালবে কে?
কেউ কিছু ভাবে না- দারুণ তুখোড় লালফিতে, উচ্চকণ্ঠ বক্তৃতামঞ্চ মধ্যপ্রাচ্য ফেরত স্লাইডরুল, ব্রীফকেস, স্টেথোস্কোপ আপাদমস্তক
অন্যের কাপড়কাটা রপ্তানীকারক কাচিঁ- সবাই সমান উদাসীন।
সুশীল সমাজ কোথায় চলেছে?

দিগন্তে দেখা যায় না কিছুই
বিশ্রী দূষণে সব অন্ধকার হয়ে আসে
চতুর্দিকে কুজ্বটিকায় আক্রান্ত বায়ুস্তর।
তাহলে এখন কোথায় ফেরাব চোখ?
কোন পথে যাবো ভবিতব্যের দিকে?

আর নয় এমন ক্রান্তিতে থাকা,
সটান চলে যেতে চাই পুষ্পের দিকে
শস্যের দিকে কোন এক অনন্য বৈশাখে।

এখন এমন দুঃসময়েও তাই চোখ বুঁজলেই দেখতে পাই
অনেক পুষ্পের সমারোহ বিস্তৃত চোখজুড়োনো দোদুল্যমান সবুজ
শস্যক্ষেত
নদীর ওপারে কাজলকালো বনানীর গাঢ় দিগন্তরেখা
কল্লোলিত দু’কুল উপচে পড়া নদীর বাকেঁ সারি সারি রঙবেরঙের
পালতোলা নৌকো।
আর ঢেউয়ের ওপরে লাফিয়ে উঠছে ঝকঝকে রোদে
ঝাকেঁ ঝাকেঁ রূপোলি ইলিশ।