কবিতা কেমন করে পাঠকের মনের মধ্যে কাজ করে তা বিভিন্ন সময়ে পণ্ডিতেরা নানাভাবে ভেবে দেখেছেন। কিন্তু একজন কবি কবিতা রচনা করেন কেন তার সঠিক উত্তর কোন কবি হয়তো একইভাবে দেবেন না। কবিতা কেমন করে তৈরি হয়, তার কোন নির্ধারিত ফর্মুলা দেয়া যায় না। কারণটা হয়তো এই যে, কবিতার ভাষা সাহিত্যের অন্য সব আঙ্গিকের ভাষা থেকে একেবারে আলাদা এবং এই অনন্যতাই কবিতার বোদ্ধাকে প্রধানত আকৃষ্ট করে। মানব সংস্কৃতিতে গত পাঁচ শতাব্দী জুড়ে মুদ্রণযন্ত্রের কারণে ভাষার যে কোন শৈলীর সৃষ্টি আমরা শুনতে নয় দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এই অভ্যাস অল্প দিনের। এর আগের অন্তত তিন সহস্রাব্দ ধরে মানুষ কেবল শুনেছে। নদীর কুলুকুলু, পাতার মর্মর, শিশু কণ্ঠের কলকল- এর সমস্ত কিছু থেকে পিপাসিত কান এবং চোখের মাধ্যমে মনের মধ্যে উঠে এসেছে শব্দ। যে শব্দ এক সময় কেবল বস্তুকে নয়, তার অবয়বকে নয়; শব্দের বিশিষ্ট এক ধ্বনি দ্যোতনার ভেতর দিয়ে বিশ্বজগতকে ধরতে চেয়েছে। কবিতা দীর্ঘ দিন তাই ছিল শ্রুতির বিষয়। আজকের দিনেও মুদ্রিত পাতায় কবিতা কেমন দেখায় তার চেয়ে কানে কেমন শোনায় তাই দিয়েই শ্রুতি থেকে স্মৃতিতে তার অধিষ্ঠান ঘটে। এখনও পর্যন্ত ধ্বনি-মাধুর্যের কারণে, যদিও কেবলমাত্র সে কারণেই নয়, আমরা সহজে কবিতা মনে রাখতে পারি।

কবিতার অনুষঙ্গে শব্দের ধ্বনিরূপ একেবারে মোলিকভাবে প্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। যে কারণে আজকের দিনের বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক বাতাবরণে খুব দ্রুত পঠন দিয়ে গদ্যের কতকগুলো তথ্য সুস্পষ্টভাবে মনে ধারণ করা গেলেও নিঃশব্দ দ্রুত পঠনে কবিতা আসলে হারিয়ে যায়। পরীক্ষার খাতিরে যখন স্কুল কলেজে কবিতা পড়তে হয় তখন হয়তো এভাবেই আমাদের মধ্যে কবিতার অপমৃত্যু ঘটে।

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তির উচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখতে পাচ্ছে যে মুদ্রিত বইয়ের যুগও বোধ হয় শেষ হয়ে এল। এখন নতুন প্রযুক্তিতে অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোচিপস থেকে কেবলমাত্র ভাষার দৃশ্যমান রূপই যে বেরিয়ে আসবে তাই নয় তার শ্রাব্য রূপও খুব সহজেই বের করে আনা যাবে। আজ থেকে এক শতাব্দী পরে আমরা কি আর এই বই পড়ব? আমার ভাবতে ভাল লাগে তখন ভাষার শ্রাব্য রূপের পুনরুত্থানের ভেতর দিয়ে কবিতা আবার জাগ্রত হয়ে উঠবে।

এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমরা এক সময় পদাবলী বলে এক সংগঠন তৈরি করেছিলাম বাংলা কবিতাকে আবার শ্রবণের মধ্যে আনবার জন্যে, সেই আশির দশকে।

তাতে হয়তো কিছুটা কাজও হয়েছিল কেননা তার পরপরই দেখেছি কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি বিষয়ে তরুণদের মধ্যে নতুন ঝোঁক। আবৃত্তিকে শিল্প হিসাবে যাঁরা নেন তাঁদের কাছে অনেক সংখ্যক শ্রোতার সমীপে তার পারফরমেন্স বা বাস্তব উপস্থাপনাটিই প্রাধান্য পায়। এর মধ্যে আবার এসে পড়ে বৃন্দ আবৃত্তি, যা অনেক সময় কবিতার আত্মাকে হরণ করে। কেননা কবিতা এককভাবে নিবিড়ভাবে উপভোগ করবার বিষয়ও বটে।

এই ধারণা থেকে বর্তমান সংকলনটির জন্ম। এখানে লিখিত কবিতার অবয়বের সঙ্গে সঙ্গে তার শ্রুতি গ্রাহ্য অবয়বটিও সংরক্ষণ করতে চেয়েছি। কবি যেমনভাবে দেখেছেন কবিতাগুলোকে এবং শুনেছেন ঠিক তেমনিভাবে পাঠকের হাতে ও শ্রবণে তুলে দেয়া হলো। কবিতা যাঁরা ভালবাসেন এই নিমগ্নতা ও ভালবাসা তাঁদের ভাল লাগলেই এই প্রয়াসটি সার্থক হবে, নইলে নয়।