নিদ্রিতা

হেতম খাঁর শীতল জমিনে আমার মা এখন ঘুমোচ্ছেন।
তালাইমারি থেকে প্রেমতলি বোসপাড়া থেকে সিরোইল
শুনি এখন প্রায় দশ লক্ষ মানুষের বসবাস।
কিন্তু আমার মাকে আর কখনো দেখিনা।
তিনি এখন আমার মনের ভেতরে স্মৃতির ভেতরে
অধিষ্ঠিত আমারি মানসে-গড়া এক অনন্য প্রতিমা।

যেমন বরেন্দ্র-প্রসূত এই জনপদ আমাদের দীর্ঘ ইতিহাসের
অপসৃয়মান স্মৃতির ভেতর থেকে ঠিকরে বেরিয়ে আসা
একটি ধারণা। এখনো কায়াময়। এবং
আপাতত কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এখানে
যূথবদ্ধ এসেছে মানুষ। আদিবাসী
কবেই ঘেঁষেছে কোণে মৃয়মান।
পারস্যের কবি হাফিজ “‍‍‌‌‌রূপসী বাংলায় আনা
পারসী মিঠাইয়ের” কথা বলেছিলেন।
এক পরিব্রাজক জানিয়েছিলেন যে,
“এ মাটিতে আসার অনেক পথ খোলা
কিন্তু বেরোবার সব পথ বন্ধ।‍’’

অথচ আমরা দেখছি যে, যায় সবই চলে যায়
রাজা রাজ্যপাট পরিব্রাজক দরবেশ শ্রমিক মানুষ।
কেবল চিরস্থায়ী থেকে যায় মাটি মাঠ মানুষের শ্রম।
হাহা পদ্মা পরিব্যাপ্ত বরেন্দ্র। প্রকৃতি তবুও থাকে
মানুষেরা চলে যায় মানুষেরই অবশ্যম্ভাবী
চলে যেতে হয়। কায়া চলে যায়।

আমার পেছনে থাকে আমারি বিমূঢ় ছায়া
স্মৃতি সঙ্গ অনুভব মন্দ্রিত জনপদে ঘোরে।
মানুষেরা চলে যায় যেমন গেছেন মাতা।
জনপদ থাকে। মাটি থেকে যায়।
স্মৃতি থাকে মাটির গভীরে।
শূন্যের দেউলে থাকে প্রতিমার কায়া।

আমার বুকেও থাকে পঞ্চাশের ছলচ্ছল
সত্তরের মানুষের ঢল তরুণের বজ্রমুষ্ঠি।
এখন কি সমস্তই স্মৃতির শিশির হয়ে ঝরবে টুপটাপ
শেষ আঘ্রাণের প্রত্যুষ-প্রদোষে নিভৃত কুয়াশায়?

মা চাইতেন সন্তানেরা সুখে থাক। থাক দুধে ভাতে।
মা তো নিদ্রিতা এখন। আর আমার চতুর্দিকে বিপর্যস্ত বরেন্দ্র ঘুমায়।